Breaking News
Home / জাতীয় / পাতাল রেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

পাতাল রেল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার

যানজট নিরসনে তৈরি মাস্টারপ্ল্যান উপেক্ষা করে ঢাকায় সাবওয়ে (পাতাল রেল) নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যে ১১টি সাবওয়ে লাইন গড়ে তোলার লক্ষ্যে ৩১৮ কোটি টাকা ব্যয়ে সমীক্ষা চলছে। কাজ শেষ হয়েছে ৬৩ ভাগ। প্রাথমিকভাবে ৪টি সাবওয়ে নির্মাণের পরিকল্পনা আছে।

মাটির ২০ থেকে ৩০ ফুট গভীরে আগামী ৫০ বছরে ১১ রুটে ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে নির্মিত হবে। এতে ৫ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের ধারণা পাওয়া গেছে। তবে অপরিকল্পিত ও ঘনবসতিপূর্ণ ঢাকায় সাবওয়ে উচ্চাকাক্সক্ষী ও অবাস্তব বলে মত দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা শহরের যানজট নিরসনে কেমন গণপরিবহণ দরকার সেটা কৌশলগত পরিবহণ পরিকল্পনায় বলা হয়েছে। সেখানে পাঁচটি মেট্রোরেল ও ২টি বিআরটির কথা বলা আছে। সেখানে সাবওয়ের কথা বলা হয়নি। এছাড়া ঢাকাকেন্দ্রিক এত বড় প্রকল্পও কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ঢাকায় এ প্রকল্পের উপযোগিতা রয়েছে, এটা বলা যাবে না।

২০০৫ সালে প্রণীত কৌশলগত পরিবহণ পরিকল্পনায় (এসটিপি) ঢাকাসহ আশপাশের যানজট নিরসনে কোথায় কী ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন হবে সে বিষয়ে বলা হয়েছে। এছাড়া ২০১৬ সালে সংশোধিত কৌশলগত পরিবহণ পরিকল্পনায় (আরএসটিপি) পাঁচটি মেট্রোরেল ও ২টি বিআরটি নির্মাণের সুপারিশ করা হয়েছে। আগের দুই মহাপরিকল্পনায় ঢাকার মতো অপরিকল্পিত শহরে পাতাল রেল নেটওয়ার্কের উপযুক্ত নয় বলে মতামত এসেছিল। কিন্তু এরপরও বলা হচ্ছে, আরএসটিপি সংশোধন করে এ পরিকল্পনার সঙ্গে সমন্বয় করেই সাবওয়ে নির্মাণ করা হবে।

এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ঢাকার যানজট নিরসনে কী ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে, সেটা এসটিপি ও আরএসটিপিতে বলা হয়েছে। সাবওয়ের কথা কোথাও বলা হয়নি। রাজউকের মাস্টারপ্ল্যানেও এ ধরনের কোনো ভূমি ব্যবহারের কথা বলা হয়নি।

এ অবস্থায় সম্পূর্ণ বাস্তবতাবিবর্জিত একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সরকার। তিনি বলেন, যানজট সমস্যার সমাধানে সরকার গণপরিবহণ, হাঁটাচলার পথসহ প্রাথমিক কাজগুলো না করে সরকার শেষের দিকে কাজ বা মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন শুরু করেছে আগে। সারা দেশের উন্নয়নের চিন্তা না করে সরকার শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক বিনিয়োগ করছে, এটা দেশের সামগ্রিক উন্নয়নে অসমতা সৃষ্টি করবে।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষের প্রধান প্রকৌশলী ও ঢাকা শহরের সাবওয়ে নির্মাণের সম্ভাব্য সমীক্ষা প্রকল্পের পরিচালক কাজী মো. ফেরদাউস বলেন, কোনো মাস্টারপ্ল্যান চূড়ান্ত নয়। ঢাকা ও আশপাশের এলাকার যানজট নিরসন ও গণপরিবহণ মাস্টারপ্ল্যান এসটিপি। সেটা সংশোধন করে আরএসটিপি করা হয়েছে। নতুন করে আবারও সংশোধনের কাজ শুরু হয়েছে।

তিনি বলেন, ঢাকার সাবওয়ে প্রকল্পের সমীক্ষা চলছে। এখনো প্রকল্প অনুমোদন হয়নি। সমীক্ষা পর্যায়ে মাস্টারপ্ল্যানভুক্ত না হলেও অসুবিধা নেই। আমরা নতুন সংশোধিত মাস্টারপ্ল্যানে সাবওয়ের বিষয়টি যুক্ত করার আবেদন জানাব। সেখানে এ প্রকল্প যুক্ত হলে তখন তো বাস্তবায়ন করতে কোনো অসুবিধা হবে না। আর অর্থনৈতিক বিবেচনায় উপযোগিতা কিনা সেটা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সরকার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক বলেন, ঢাকা শহরে গণপরিবহণে বিশৃঙ্খল অবস্থা বিরাজ করছে। এটার দায়িত্ব কেউ নিচ্ছে না। রাস রুট র‌্যাশনালাইজেশন কার্যক্রমের খবর নেই। হাঁটাচলার উপযোগী ফুটপাত, সড়ক নেই। চলাচলের জন্য মানসম্মত বাস নেই। সেসব সমস্যার সমাধান না করে সাবওয়ের পথে হাঁটা অবাস্তব চিন্তা। জানা যায়, ১১টি রুটের মধ্যে প্রাথমিকভাবে অগ্রাধিকার দেওয়া ৪টি রুট সুনির্দিষ্ট করেছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান।

বাকি ৭ রুটের রূপরেখা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ শেষে পাওয়া যাবে। প্রাথমিকভাবে চিহ্নিত চারটি সাবওয়ের রুটের মধ্যে রয়েছে- টঙ্গী থেকে ঝিলমিল পর্যন্ত ২৯ কিলোমিটার, কেরানীগঞ্জ থেকে সোনাপুর ১৯ কিলোমিটার, নারায়ণগঞ্জ থেকে উত্তরা ১৩ নম্বর সেক্টর পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার এবং গাবতলী থেকে মাস্তুল পর্যন্ত ১৯ কিলোমিটার। এর মধ্যে ২০৩০ সালের মধ্যে ১০২ কিলোমিটার, ২০৪০ সালের মধ্যে আরও ৮৫ কিলোমিটার এবং শেষ ধাপে ২০৫০ থেকে ২০৭০ সালের মধ্যে ৭১ কিলোমিটার সাবওয়ে লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে।

আর সবমিলিয়ে সাবওয়ে নেটওয়ার্ক সংখ্যা হবে ২১৫টি। স্পেসভিত্তিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘ফিজিবিলিটি স্টাডি অ্যান্ড প্রিলিমিনারি ডিজাইন ফর কনস্ট্রাকশন অব ঢাকা সাবওয়ে’ শিরোনামে সাবওয়ের নেটওয়ার্ক প্রস্তাব ১৫ মার্চে জমা দিয়েছে। এগুলোর নির্মাণে আরও কত টাকা ব্যয় হবে, সেটা জানতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাজ শেষ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। সেতু বিভাগ বলছে, এ বিপুল পরিমাণ ব্যয়ের প্রকল্প বিল্ড, ওন অপারেট, ট্রান্সফার (বুট) পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করা হবে। এ ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান নিজের জোগাড় করা অর্থায়নে প্রকল্প বাস্তবায়ন করে পরিচালনার মাধ্যমে ব্যয় তুলে নেওয়ার পর সাবওয়ে সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে।

বাংলাদেশ সেতু কর্তৃপক্ষ (বিবিএ) বলছে, ২০২৫ সালের মধ্যে ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রথম পাতাল রেল নির্মাণের জন্য প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। গত বছরের ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠিত তৃতীয় পাবলিক-প্রাইভেট-পার্টনারশিপ (পিপিপি) যৌথ প্ল্যাটফরম বৈঠকে দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে বিনিয়োগের জন্য একটি প্রস্তাব রেখেছিল। আর একটি সাবওয়ে ব্যবস্থা সড়কে যানবাহনের চাপকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস করবে। যেখানে ১০০টি বাস প্রতি ঘণ্টা ১০ হাজার যাত্রী বহন করতে পারে। সেখানে পাতাল রেল প্রতি ঘণ্টায় ৬০ হাজার যাত্রী পরিবহণ করতে সক্ষম। এছাড়া একটি ফ্লাইওভারের সম্ভাব্য অর্থনৈতিক জীবন ৫০-৬৫ বছর।

আর একটি সাবওয়ের সম্ভাব্য আয়ুষ্কাল ১০০-১২৫ বছর হবে।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি) বলছে, ঢাকার সাবওয়ে নির্মাণের ক্ষেত্রে সরকারের সমীক্ষা প্রকল্প প্রধানত কারিগরি সমীক্ষা। এ ধরনের মেগা প্রকল্পের কোনো দিকনির্দেশনার জন্য প্রণীত এসটিপি, আরএসটিপি, ঢাকার মাস্টারপ্ল্যানে নেই। পরিবহণ বিষয়ক অবকাঠামোগত পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় দীর্ঘদিন ধরেই পরিকল্পনা প্রস্তাব অনুসরণ করা হচ্ছে না। এরপরও বিচ্ছিন্নভাবে ও পর্যাপ্ত পরিকল্পনাগত বিশ্লেষণ না করেই মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের ধারা লক্ষ করা যাচ্ছে।

২০০৫ সালে প্রণীত এসটিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বাসভিত্তিক গণপরিবহণকে প্রাধান্য দিয়ে নগর যোগাযোগ ব্যবস্থা প্রণয়ন, বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) নির্মাণ ও পথচারীবান্ধব যোগাযোগ গড়ে তোলার পাশাপাশি ট্রাফিক ম্যানেজমেন্টের বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল। এ ধরনের প্রকল্প প্রস্তাবনা বাস্তবায়ন তুলনামূলক সাশ্রয়ী, আমাদের আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় পরিকল্পনাগত দৃষ্টিকোণ থেকে কার্যকর সমাধান বলে বিবেচিত। ঢাকা শহরে কয়েক হাজার আধুনিক বাস চালু করার মতো সহজসাধ্য সমাধান গত ১৫ বছরেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয়নি। এটা করা সম্ভব হলে নগর যাতায়াত ব্যবস্থাকে স্বল্প ব্যয়ে কার্যকর সমাধান দিতে পারত।

এদিকে সেতু বিভাগ বলছে, মেট্রোরেল প্রকল্পের মাধ্যমে ঢাকার যানজটের বিদ্যমান সমস্যার সমাধান হচ্ছে না। ঢাকায় মেগাপ্রকল্প প্রণয়নের ক্ষেত্রে ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ও রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) মতামত নেওয়া হয়। সাবওয়ে প্রকল্পের পরামর্শক নিয়োগ করে কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হলেও এ ধরনের কোনো তৎপরতা লক্ষ করা যায়নি।

বিআইপি সাবওয়ের উপযোগিতার বিষয়ে জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নগরপরিকল্পনা বিশ্লেষণে বেরিয়ে এসেছে সাবওয়ে উচ্চ আয়ের দেশগুলোর সীমিতসংখ্যক কিছু শহরে নির্মিত হলেও এটি অতি ব্যয়বহুল প্রকল্প। ফলে বিশ্বের অতি ধনী দেশগুলো এখন নতুন করে নগরের বিস্তৃত নেটওয়ার্কজুড়ে সাবওয়ে নির্মাণের মতো উচ্চভিলাষী প্রকল্প পরিকল্পনা নিচ্ছে না।

এ অবস্থায় বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে। বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় উন্নত দেশের তুলনায় এখনো অতিনগণ্য। বর্তমান বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ২০৬৪ ডলার। এর বিপরীতে আমেরিকার ৭০ হাজার ডলার, সিঙ্গাপুর ৬৫ হাজার ডলার, জার্মানি ৫০ হাজার ডলার, ইংল্যান্ড ৪৫ হাজার ডলার, জাপান ৪০ হাজার ডলার।

সাবওয়ে প্রসঙ্গে গত ২৪ মার্চ ঢাকায় এক সেমিনারে সড়ক পরিবহণ ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, সাবওয়ে নির্মিত হলে ঢাকা শহরের প্রায় ৮০ লাখ কর্মজীবী মানুষের মধ্যে অর্ধেক মানুষ মাটির নিচে স্থানান্তর হবে। ফলে মাটির উপরিভাগ যানজট ও জনজটমুক্ত থাকবে।

তিনি বলেন, শেখ হাসিনা সরকারের সব কাজের উদ্দেশ্য জনকল্যাণ। জনস্বার্থে কাজ করতে হবে, কমাতে হবে জনভোগান্তি। বিভিন্ন সংস্থার মাধ্যমে বাস্তবায়নাধীন একই ধরনের প্রকল্পগুলোর সঙ্গে বাড়াতে হবে সমন্বয়। কাজের গুণগত মান সুরক্ষার পাশাপাশি নির্ধারিত সময়ে নির্মাণকাজ শেষ করতে হবে।

তা না হলে প্রকল্প ব্যয় বেড়ে যায় এবং সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ পড়বে। এছাড়া প্রকল্প গ্রহণের আগে এর প্রয়োজনীয়তা এবং কার্যকারিতার বিষয়টিকেও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে।

Check Also

ঢাকা চট্টগ্রাম ও সিলেট মহাসড়ক হবে স্বস্তির সড়ক – ওসি মনিরুজ্জামান

যানজট নিরসনের যাত্রীদের জন্য ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক হবে স্বস্তির সড়ক হবে বলে জানান কাঁচপুর হাইওয়ে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *